পোশাক নয়, পতন বিবেকের

পোশাক নয়, পতন বিবেকের - Surma Times | Sylhet News

সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম কাণ্ডে জামায়াতের বিবৃতিসাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপির হোটেল কাণ্ডের পর পরিচিত একজন নারী ফেসবুকে নক দিয়ে জানালেন, “তার জীবনে যত হুজুর দেখেছেন, তাদের বাইরে এক, ভিতরে আরেক!” ঘটনা কী আসলে তাই? যে কুকাজ করে এমপি দল থেকে বহিষ্কার হয়েছে, সারা দেশে নিন্দিত হয়েছে সেই অকাজ কেবল হুজুররাই করে? মাদ্রাসার কিছু ঘটনা, পত্রিকার কিছু শিরোনামে হুজুরদের একাংশকে দায়ী করা যায় বটে তবে নৈতিক পদস্খলনের পিক পিরিয়ডে সর্বত্রই, সব পোশাকের, সব পেশার, সব কালারের এবং সব বয়সের কিছু মানুষ চারিত্রিক অবদমনে আক্রান্ত হয়েছে। পর্যটন স্পটের হোটেল-মোটেল,  নিরিবিলির গেস্ট হাউস, খালি ফ্ল্যাটে কিংবা গোপন রুমে বৈধতার সাথে অবৈধের যাত্রা পাল্লা দিয়ে! সিসি ক্যামেরা সৌজন্যে সামান্যই সামনে আসছে।

 

তবে দায় হুজুরদের বেশি কেন? প্রচারে হুজুরবেশীরা এগিয়ে কেন? ঘৃণা হুজুরদের প্রতি বাড়ে কেন? এর পেছনে অবশ্য যৌক্তিক কারণ আছে। আমাদের ভেতরে একটা মূল্যবোধ আছে। যে মূল্যবোধে ইসলামের লেবাসধারী, মাদ্রাসায় যাতায়াতকারী, ধর্ম মান্যকারীদের থেকে আমাদের প্রত্যাশা পরম। তারা কোনো অপরাধে জড়াতে পারে তা আমাদের বিশ্বাস পারমিট করে না। মানুষ আশা করে, অন্তত এই শ্রেণির মানুষগুলো এইসব কুকীর্তিতে জড়াবে না। যারা সমাজ থেকে বেশি সম্মান পায় তাদের পদস্খলন হলে ঘৃণাও বেশি জন্ম নেয়— স্বাভাবিক। একই অপরাধ যখন দুই মেরুর দু’জন মানুষ করবে, একজন শার্ট-প্যান্ট পরিহিত আরেকজন জুব্বা-টুপি মুড়িয়ে, তখন মানুষ দ্বিতীয়জনকেই বেশি ঘৃণা করবে। এটা শতবছর ধরে গড়ে ওঠা মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। যে ধর্মের কথা বলে, ধর্ম মেনে চলে তারা দ্বারা অশুচি শোভা পায় না।

 

তাকওয়া না থাকলে হুজুর খেজুর হয়ে ওঠে। ধর্ম তো আসলে পোশাকে, দাঁড়িতে থাকে না; থাকে হৃদয়ে। অশ্লীলতার চরম চর্চায়, নগ্নতার সহজ প্রাপ্তিতে এবং মোবাইল-ইন্টারনেটের বদৌলতে যে কেউ যেকোনো সময় বিগড়ে যেতে পারে। সবকিছুই তো সহজলভ্য,  হাতের নাগালে, ইচ্ছার সামনে দাঁড়িয়ে। এতে শিশু, কিশোর, যুবক কিংবা বৃদ্ধ— কারো আর সাধু থাকার সুযোগ নেই। এক হাত বাড়ালেই যখন অপরাধের সব উপকরণ পাওয়া যায় তখন নিজেকে কন্ট্রোল করা ততটা সহজ নয় যতটা ভাবা হয়। এজন্য হৃদয়ে রসদ থাকতে হয়। যারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং প্রমিজ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তারাই কেবল বিশ্বাসে অটুট থাকতে পারে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও এক্ষেত্রে দায়ী, আছে আইনের যথার্থতার ঘাটতিও। কল্যাণকর আইনের প্রয়োগ থাকলে বৃদ্ধ ছুঁড়ী নিয়ে হোটেলে সময় ব্যয় করার সুযোগ পেতো না। অন্তত আগেই ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো। যারা স্রষ্টার ভয়ে ভীত হয় না তাদেরকে রাষ্ট্রের আইন দিয়ে ভয় পাইয়ে দিতে হয়।

 

সাতক্ষীরার সেই এমপির কথা ভাবী— সন্তান/নাতি-নাতনীদের সামনে এই লোক মুখ দেখাবেন কী করে? সমাজে চলবেন কোন লজ্জায়? এরচেয়ে মরে যাওয়া সম্মানের। মানুষ যখন চরমভাবে বিকারগ্রস্ত হয় তখন সে বিবেকের আবেদন, শৈশবের শিক্ষা এবং ধর্মের নিষেধ পরিত্যাগ করে অবাধ যৌনাচারে জীবন ডুবিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে জেনারেল শিক্ষিত কিংবা ধর্মের শিক্ষায় শিক্ষিত— পশু হতে কারো বিবেকেই বাধা হয় না। অনেক জেনারেল মানুষদের থেকে যে অপরাধ স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মেনে নেওয়া হয়, হুজুরদের ক্ষেত্রে সেই একই ক্যাটেগরির অপরাধ প্রকাশ্যে এলে ঘৃণায় রি রি ওঠে। অথচ দু’টোই নিন্দিত, দু’টোই অপরাধ। আমরা একচোখা দেখে একটাতে কত গুরুত্ব দিয়ে অন্যটাকে বেশি ঘৃণা দেখিয়ে প্রচার করি। সমাজ বিশুদ্ধ করতে হলে উৎস থেকেই ঠেকাতে হবে। সকল অন্যায়, অনৈতিকতায় সমান ঘৃণা পুষতে হবে।

 

কী করলে এই অপরাধ কমবে? অপরাধ যখন সামনে আসে তখন যত কথা বলি কিংবা প্রতিবাদ করি, যখন ঐশ্বরিক বিচারের দাবি ওঠে তখন তারচেয়েও বেশি বিরোধিতা করি। গ্রামের সাধারণ ছোমেদের যে বিচার হবে, একজন সাংসদ তাও ইসলামিক রাজনীতির— দু’জনের একরকম বিচার করলে সমাজ থেকে এই অবৈধ যৌনতা, ধর্ষন কিংবা অবাধ মেলামেশার সংস্কৃতি কখনোই বন্ধ হবে না। যে মাদ্রাসা শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বলৎকার করে তাকে সামাজিক ঘৃণা দিয়ে, দুই-পাঁচবছর জেল দিয়ে এই অপরাধের লাগাম টানা যাবে না কিংবা মূলোৎপাটন হবে না। অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে শরিয়াহ কায়েম করা লাগবে। পাথর নিক্ষেপ না হোক অন্তত বায়তুল মোকাররম কিংবা সংসদ ভবনের সামনে শত মিডিয়ার উপস্থিতিতে ব্রাশ ফায়ার কিংবা ফাঁসির রজ্জুতে না ঝুলালে এমপি মেয়ে নিয়ে হোটেলে যাবে, শিক্ষক ছাত্রী নিয়ে গোপনে কক্সে রাত কাটাবে! এইসব বিষয়ে আপস কইরেন না।  তাহলে সমাজ সুস্থ থাকবে না। আমরা একটা বাসযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য সমাজের প্রত্যাশা করি।

 

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।  

[email protected]

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article