এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট, আসামি ৯৯

এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট, আসামি ৯৯ - Surma Times | Sylhet News

এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট, আসামি ৯৯ - Surma Times | Sylhet Newsসুনামগঞ্জ, ৩১ অক্টোবর: মীরপুর বাজারে ইউনিয়ন বিএনপি কার্যালয়ে অনধিকার প্রবেশ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী ও স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য এম এ মান্নানসহ মোট ৯৯ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। জগন্নাথপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অনিক পাল দীর্ঘ তদন্ত এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে গত ৩১ জুলাই বিজ্ঞ আদালতে অভিযোগপত্র নং- ১২১ দাখিল করেন।

এই ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়টিই হয়ে ওঠে সহিংসতার কেন্দ্র। সেই সূত্রেই দায়ের হয় মামলা। ১৯ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে জগন্নাথপুর থানায় দায়ের করা ওই মামলাটি (নম্বর- ১২) বিচারে সোপর্দ করার উদ্দেশ্যেই পুলিশ এই প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৪২৭, ৪৩৬, ৩৮০, ১১৪ এবং ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। এতে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে ১ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। তাকে ঘটনার প্রধান ষড়যন্ত্রকারী ও উসকানিদাতা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

মামলার বাদী মীরপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো: আব্দুর নূর। তার দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাকর্মী বাজারে সংঘবদ্ধ হয়ে ক্রমাগত উসকানিমূলক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে অভিযুক্তরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মীরপুর বাজারে অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে তাণ্ডব চালায়।

চার্জশিটের বর্ণনা মতে, ওই রাতের হামলায় সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান (৭২)-এর নির্দেশ ও প্ররোচনা ছিল। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অপরাধে তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি না থাকলেও দণ্ডবিধির ১১৪ এবং ৩৪ ধারায় অপরাধের রূপরেখা তৈরির দায়ে সাবেক এই মন্ত্রীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ উল্লেখ করেছে, তার সবুজ সংকেত ও প্ররোচনাতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিএনপির কার্যালয়ে হামলা চালায়।

এই মামলার অন্যতম আলোচিত দিক হলো সাবেক মন্ত্রীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে ল্যাপটপ ও এলইডি টিভি চুরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় কার্যালয়ের ভেতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়। এর মধ্যে মামলার ৩৫ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি জামিল হোসেন ইফতি (২৪), যিনি মীরপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, কার্যালয় থেকে ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) টাকা মূল্যের একটি দামি ল্যাপটপ চুরি করে নিয়ে যান বলে তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া ২৫ নম্বর আসামি নুর মোহাম্মদ জুয়েল অফিসকক্ষে থাকা ২০,০০০ টাকা মূল্যের একটি ৩২ ইঞ্চি এলইডি টিভি চুরি করেন। দণ্ডবিধির ৩৮০ ধারায় এই চুরির অপরাধ যুক্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ আনা হয়েছে।

হামলার সময় ১১ নম্বর আসামি আব্দুস সালাম রিজভি পেট্রোলিয়াম বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে অফিসে আগুন ধরিয়ে দেন। অন্যান্য আসামিরা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবিসহ দলীয় প্রতীক ও জাতীয় পতাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালান।

চার্জশিটভুক্ত মোট ৯৯ জন আসামির মধ্যে এক নম্বর এজাহারনামীয় আসামি সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানসহ মোট ৪৯ জন আসামি বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিন লাভ করেছেন। সরাসরি হিংসাত্মক হামলায় অভিযুক্ত ২ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি রেজাউল করিম রিজু এবং ৭ নম্বর আসামি আব্দুস সহীদ মেম্বার বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আটক রয়েছেন। অন্যদিকে ল্যাপটপ ও টিভি চুরির সঙ্গে জড়িত জামিল হোসেন ইফতিসহ মোট ৪৮ জন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাদের বিচারে উপস্থিত করতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৭ ও ৮৮ ধারা অনুযায়ী আদালতের নিকট গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ক্রোকি পরোয়ানা জারির আবেদন জানানো হয়েছে।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পোড়া আসবাবপত্র, দগ্ধ প্লাস্টিক ও ব্যানারের অবশিষ্টাংশ আলামত হিসেবে জব্জ করেছে। চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে মামলাটি এখন চার্জ গঠন ও সমন জারির পরবর্তী ধাপে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ তদন্তের পর্ব শেষ, শুরু হয়েছে বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

বিষয়টি নিয়ে জগন্নাথপুর থানার ওসি মোখলেছুর রহমান জানান, তিনি গতকালই যোগদান করেছেন এবং এই চার্জশিটের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে অভিযোগপত্রটি দেখে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর দেশের অনেক স্থানের মতো সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরেও দলীয় কার্যালয় ও স্থাপনা কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো এখন একের পর এক চার্জশিট পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। মীরপুর বাজারের এই মামলাটি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। স্থানীয় রাজনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড়, কারণ এতে সাবেক এক মন্ত্রীকে প্রধান ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে কবে চার্জ গঠন করেন এবং পলাতক ৪৮ জনকে বিচারের আওতায় আনা যায় কি না। সেই জবাব দেবে সময়ই।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article