সিলেট, ৪ সেপ্টেম্বর: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের ঘিলাতৈল গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সংঘর্ষে জড়িয়েছেন বর্তমান ইউপি সদস্য মনসুর আহমদ ও সাবেক ইউপি সদস্য পংকি মিয়ার সমর্থকরা। এই সংঘর্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে আহত হয়েছেন খোদ জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই সংঘর্ষে অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। তবে ইউপি সদস্য মনসুর আহমদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে আহতের সংখ্যা প্রায় ২৫ জন। সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। মনসুর আহমদের দাবি অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের লোকজন প্রায় ১০টি ঘরবাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে। যদিও ভাঙচুরের প্রকৃত সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
শুক্রবারের এই সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। এর আগের দিন, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে একই দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়েছিল। সে সময় পথচারীসহ প্রায় ১৮ জন আহত হন বলে জানা যায় স্থানীয় সূত্রে। আহতদের মধ্যে অবস্থা গুরুতর থাকা পাঁচজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় সিলেটে।
বৃহস্পতিবার রাতের সংঘর্ষের পর পুলিশ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান জানানো হয় এলাকাবাসীর প্রতি। সেই সঙ্গে সতর্ক করে দেওয়া হয়, কোনো পক্ষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে গ্রেপ্তার করা হবে। তারপরও শুক্রবার সকালেই ফের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ।
বিরোধের নেপথ্যে কেবল আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নয়, রয়েছে আরও গভীর কারণ। স্থানীয়দের ভাষ্য, মানবপাচার, চোরাচালান ও বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ দিন দিন জটিল আকার ধারণ করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, ঘিলাতৈলকে কেন্দ্র করে চোরাচালানের একটি কথিত রুট গড়ে উঠেছে, আর সেই রুটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে চলছে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিরোধকে ঘিরে সামাজিক বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টারও অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসীর একাংশ। কারো কারো ভাষ্য, ‘নোয়াখালী-সিলেট’ পরিচয়কে সামনে এনে স্থানীয়দের মধ্যে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
ইউপি সদস্য মনসুর আহমদ অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েক মাস ধরে ঘিলাতৈল এলাকায় মানবপাচার ও চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় এলাকার যুবসমাজ এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করে আসছিল। তার দাবি, বিশেষ করে মুন্না নামের এক যুবক এ বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখায় বেন্ডেজ করিম ও তার ভাই সাবেক ইউপি সদস্য পংকি মিয়া এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। মনসুর আহমদ আরও বলেন, বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার পথে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে পথরোধ করে মারধর করে, আর এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। দুই দিনের ঘটনা মিলিয়ে প্রায় ২৫ জন আহত ও প্রায় ১০টি ঘরবাড়ি ভাঙচুরের দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ হিসেবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাফিজ ও দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহারুল আলম বাহারের আহ্বানে শুক্রবার বিকেলে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। সাবেক ইউপি সদস্য পংকি মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে তার প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজেও আহত হয়েছেন। তিনি জানান, দুই পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে এবং অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরপর দুই দিনে একই এলাকায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় ঘিলাতৈলসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে চাপা আতঙ্ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই বিরোধ আরও বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তাই সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সেই সঙ্গে মানবপাচার, চোরাচালান ও অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ঘিলাতৈলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ চাইছেন স্থানীয়রা।






