মুম্বাই, ২ সেপ্টেম্বর: বলিউডে শীর্ষ অভিনেত্রীর তালিকা কখনোই ছোট ছিল না। ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, দীপিকা পাড়ুকোন, আলিয়া ভাট, ক্যাটরিনা কাইফ, আনুশকা শর্মা কিংবা কারিনা কাপুর খানের মতো নাম এখনো দর্শকমনে সমান আকর্ষণীয়। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই তারকারা ধীরে ধীরে সিনেমায় নিজেদের উপস্থিতি সীমিত করে ফেলছেন। কেউ কেউ তো প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমা থেকে প্রায় সরেই গেছেন, যেমনটা ঘটেছে ক্যাটরিনা কাইফ ও আনুশকা শর্মার ক্ষেত্রে।
অন্যদিকে কৃতি স্যানন, তৃপ্তি দিমরি, জাহ্নবী কাপুর, রাশমিকা মান্দানা কিংবা অনন্যা পান্ডের মতো নতুন প্রজন্ম প্রতি বছর তিন থেকে পাঁচটি সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় করছেন। শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীদের এই পর্দা-অনুপস্থিতি আসলে কাকতালীয় কিছু নয়, বরং সম্পূর্ণ পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ফল। কী সেই পরিকল্পনা, যার কারণে রুপালি পর্দায় তাদের সরব উপস্থিতি কমে এসেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি কারণ।
প্রথম কারণ হিসেবে উঠে আসছে পরিবার ও নিজের জন্য সময় বরাদ্দ রাখার প্রবণতা। আলিয়া ভাট, দীপিকা পাড়ুকোন ও কিয়ারা আদভানির হাতে বর্তমানে মাত্র এক বা দুটি সিনেমার কাজ রয়েছে, অথচ কয়েক বছর আগেও বছরে তিনটি করে সিনেমায় দেখা যেত তাদের। আলিয়া এখন করছেন ‘আলফা’, দীপিকা করছেন ‘কিং’, বছরে একটি সিনেমাতেই যেন সীমাবদ্ধ তাদের কর্মপরিধি। ক্যাটরিনা কাইফ ও আনুশকা শর্মার ক্ষেত্রে তো সেই একটি সিনেমার নিয়মও প্রযোজ্য নয়। ব্যক্তিগত জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনার বাইরে সরে যাওয়ার এই ধারা শুরু করেছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, যা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই। এখন শুধু পরিবারের জন্য নয়, নিজের জন্যও সময় রাখাটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। শ্রদ্ধা কাপুরের হাতেও বর্তমানে মাত্র একটি সিনেমার কাজ, বড় পরিচালক বা সুপারস্টারের সঙ্গে কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্দান্ত কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় শিডিউল ফাঁকা রাখতেই বেশি আগ্রহী তারা।
দ্বিতীয় কারণ অর্থনৈতিক। বলিউডে অভিনেত্রীদের পারিশ্রমিক এখনো অভিনেতাদের তুলনায় অনেক কম, ক্যারিয়ারও তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। অভিনেতারা যেখানে ষাট বছর বয়সেও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন, সেখানে অভিনেত্রীদের চল্লিশের কোঠাতেই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অবসরের দিকে। এই বাস্তবতা থেকেই অনেকে বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় আয়ের পথ। গত পাঁচ বছরের একটি বড় অংশ নিজের বিউটি ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়তে ব্যয় করেছেন ক্যাটরিনা কাইফ। দীপিকা পাড়ুকোন গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, স্টার্টআপে বিনিয়োগ করতে চান তিনি, এজন্য মানুষের কাছে ব্যবসায়িক ধারণাও আহ্বান করেছিলেন এবং সেগুলো মূল্যায়নে গঠন করেছেন একটি দল। অনেকটা নিজস্ব ‘শার্ক ট্যাংক’ চালু করার মতোই উদ্যোগ এটি। তামান্না ভাটিয়া শুরু করেছেন জুয়েলারি ব্যবসা, আলিয়া ভাটের রয়েছে শিশুদের পোশাকের ব্যবসা, পাশাপাশি আরও কয়েকটি খাতে বিনিয়োগ করে ভালো রিটার্নও পেয়েছেন তারা। অর্থাৎ সিনেমা এখন আর তাদের আয়ের প্রধান উৎস নয়, তারকাখ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত অনেকেই।
তৃতীয় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের আকর্ষণ। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান সিজন টু’-তে সামান্থা রুথ প্রভুর অভিনয়, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার ‘সিটাডেল’ ও ‘দ্য ব্লাফ’, কারিনা কাপুর খানের ‘জানে জান’, আলিয়া ভাটের ‘হার্ট অব স্টোন’ ও ‘ডার্লিংস’, তামান্না ভাটিয়ার ‘লাস্ট স্টোরিজ টু’, এসব প্রকল্প প্রমাণ করে ওটিটিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করার প্রবণতা বাড়ছে শীর্ষ অভিনেত্রীদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে পরিচালক আব্বাস বার্মাওয়ালা ভ্যারাইটি ইন্ডিয়াকে বলেন, অনেক অভিনেত্রী স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন কারণ সেখানে ভালো চরিত্র পাওয়া যায়। তার ভাষায়, বক্স অফিসে সাফল্য পাওয়া এই অভিনেত্রীরা এখন পুরস্কার ও জাতীয় স্বীকৃতির দিকেও নজর দিচ্ছেন। একই সুরে কথা বলেন পরিচালক রাহুল ঢোলাকিয়াও, তার মতে দর্শক শীর্ষ অভিনেত্রীদের পর্দায় আরও বেশি দেখতে চাইলেও তাদের অগ্রাধিকার এখন ভিন্ন জায়গায়, তাই নির্মাতাদের এমন চরিত্র লিখতে হবে যা তাদের সত্যিকার অর্থে আকৃষ্ট করতে পারে। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার সুপর্ণ ভার্মা জানান, শুরুতে ওটিটি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা থাকলেও এখন তা কেটে গেছে এবং অভিনেত্রীরা তাদের তারকামূল্য অনুযায়ী পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন সেখানে।
চতুর্থ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সিনেমার ধরন বদলে যাওয়ার প্রসঙ্গ। বর্তমানে যেসব সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলোতে নারী চরিত্র মূলত কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকছে না। পরিচালক মুদাসসার আজিজের মতে, হিন্দি সিনেমার শীর্ষস্থানীয় নায়িকাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে এ ধরনের প্রকল্পে কাজ করা মানানসই নয় বলেই তারা এসব সিনেমা এড়িয়ে চলছেন। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘অ্যানিমেল’, ‘পুষ্পা’ কিংবা ‘ধুরন্ধর’-এর মতো সিনেমায় নারী চরিত্রের গুরুত্ব ক্রমেই কমছে, আর দর্শকের রুচিতেও এসেছে সেই পরিবর্তন।
পঞ্চম কারণ ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা। এমন এক ইন্ডাস্ট্রিতে যেখানে সর্বশেষ সিনেমার ফলাফলই একজন তারকার বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেয়, সেখানে বক্স অফিসে ব্যর্থতা কেবল সিনেমার বাজেটই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত করে অভিনেত্রীর ব্র্যান্ডমূল্যকেও। তাই একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য প্রায় ঝুঁকিমুক্তভাবে চলার সুযোগ থাকলে, উচ্চঝুঁকির থিয়েট্রিক্যাল সিনেমার জন্য বাজি ধরার প্রয়োজন অনেকেই আর অনুভব করেন না।
তবে সব অভিনেতাই যে বিরতিহীন কাজ করেন, তা নয়। শাহরুখ খান ২০১৮ সালে ‘জিরো’ মুক্তির পর দীর্ঘ বিরতিতে ছিলেন, পরে ২০২৩ সালে ফিরে আসেন ‘পাঠান’, ‘জওয়ান’ ও ‘ডানকি’ নিয়ে। আমির খানও পরিচিত কয়েক বছর পরপর একটি সিনেমায় কাজ করার জন্য। প্রদর্শক ও পরিবেশক অক্ষয় রাঠির মতে, বিষয়টি পুরোপুরি ব্যক্তিগত পছন্দের, কারিনা কাপুর খান বা ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের মতো তারকারা কয়েক দশক ধরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন বলেই ধীরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, একইসঙ্গে এই ফাঁকা জায়গা সুযোগ করে দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের উজ্জ্বল হয়ে ওঠার।
আলোচনায় এসেছে ‘কুইন বি’ প্রবণতার প্রসঙ্গও। শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীর উচ্চ পারিশ্রমিকের সঙ্গে যুক্ত হয় তার ব্যক্তিগত টিম ও আনুষঙ্গিক খরচ, যা সিনেমার মোট বাজেট অনেক সময় অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়। এ কারণে প্রযোজকরা ক্রমেই ঝুঁকছেন কম পারিশ্রমিকের তরুণ অভিনেত্রীদের দিকে। যেমন দীপিকা পাড়ুকোন ‘স্পিরিট’ থেকে সরে দাঁড়ানোর একদিন পরই সেই জায়গা নেন তৃপ্তি দিমরি, আর ‘কল্কি টু’-তে দীপিকার জায়গায় দেখা যায় সাই পল্লবীকে। তবে পরিচালক আব্বাস বার্মাওয়ালা মনে করেন, কোনো নির্মাতা শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীকে নিতে চাইলে তার চাহিদামতো পারিশ্রমিক দিতেও প্রস্তুত থাকতে হয়। অন্যদিকে মালহোত্রা এই বাজেট-তত্ত্ব খারিজ করে বলেন, একটি সিনেমার চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণে অনেক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়, শুধু অভিনেত্রীর পারিশ্রমিকের ওপর তা নির্ভর করে না।
সবশেষে উঠে আসছে ব্র্যান্ড-শক্তির প্রসঙ্গ। বক্স অফিস সাফল্য ও ডিজিটাল উপস্থিতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ব্র্যান্ডমূল্য এখন অনেক সময় সিনেমা থেকে আয়ের চেয়েও লাভজনক হয়ে উঠেছে। একটি সিনেমায় সময় ও শ্রম বিনিয়োগ বছরে হাতে গোনা কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু করপোরেট দুনিয়ায় একজন তারকা একই সময়ে ৩০ থেকে ৪০টি ব্র্যান্ডের মুখ হতে পারেন, পাশাপাশি রয়েছে বিয়ে বা স্টেজ পারফরম্যান্সের মতো আয়ের উৎসও, যেখানে সামান্য কয়েক মিনিটের উপস্থিতির জন্যও মেলে কোটি টাকা। ফলে সিনেমা এখন অনেকটাই হয়ে উঠেছে ‘প্যাশন প্রজেক্ট’, আর অর্থ ও ব্যবসাই পরিণত হয়েছে বলিউডের শীর্ষ অভিনেত্রীদের প্রকৃত শক্তির উৎসে।






