হবিগঞ্জ, ৩০ আগস্ট: হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চিমটিবিল সীমান্তে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন সোহাগ মিয়া নামের এক বাংলাদেশি যুবক। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দিনভর দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য।
নিহতের পরিবারের দাবি, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তথা বিএসএফের গুলিতে মারা গেছেন সোহাগ। চুনারুঘাট উপজেলার চিমটিবিল এলাকার সফিকুল ইসলামের ছেলে সোহাগ প্রতিদিনের মতো এদিন সকালেও গরু চরাতে গিয়েছিলেন সীমান্তে। স্বজন ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, এতে গুরুতর আহত হন তিনি। দীর্ঘক্ষণ খোঁজ না পেয়ে স্বজনরা সীমান্তে অনুসন্ধানে বের হন এবং একপর্যায়ে তাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। দ্রুত উদ্ধার করে চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সিরাজাম মুনিরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের চাচা আবদুল কাদির দাবি করেন, তার ভাতিজা গরুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন সীমান্তে, কিন্তু বিএসএফ চোরাকারবারি সন্দেহে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
তবে ঘটনার ব্যাখ্যায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে বিজিবির বক্তব্যেও। হবিগঞ্জ ৫৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তানজিলুর রহমান প্রথমে জানিয়েছিলেন, গরু চোরাকারবারি শনাক্ত করে বিএসএফ গুলি চালালে ওই ব্যক্তি প্রাণ হারান। পরে তিনি জানান, প্রকৃতপক্ষে চোরাকারবারিদের নিজেদের মধ্যকার গোলাগুলিতেই সোহাগ নিহত হন। বিকেলে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রথমে বিএসএফের গুলিতে এই যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হলেও, বিএসএফের সঙ্গে কথা বলার পর তারা নিশ্চিত করেছে যে তাদের গুলিতে এই মৃত্যু ঘটেনি। তার ভাষায়, ধারণা করা হচ্ছে ভারতীয় চোরাকারবারিদের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সোহাগসহ কয়েকজনের দ্বন্দ্ব হয়, আর সেই দ্বন্দ্বেই চোরাকারবারিদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। ঘটনার সময় সোহাগের সঙ্গে থাকা তার এক ভাই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে এসে পুরো ঘটনা বিজিবি ও পুলিশকে জানান বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে আরও খতিয়ে দেখার কথাও জানান এই কর্মকর্তা।
বিজিবি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চিমটিবিল সীমান্তের বাসিন্দারা হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পান। পরে মাটিতে এক ব্যক্তির পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে পোশাক দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, তিনি একজন বাংলাদেশি। পরিবার লাশ শনাক্ত করে জানায়, তিনি সোহাগ মিয়া। ঘটনাস্থল ছিল চিমটিবিল সীমান্ত এলাকার শূন্য লাইন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভারতীয় অংশে, এমনটাই জানিয়েছেন লে. কর্নেল তানজিলুর রহমান। তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই বিজিবি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং নিহতের লাশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
বেলা সাড়ে ৩টার পর চুনারুঘাট থানা পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে সোহাগ মিয়ার সুরতহাল সম্পন্ন করে। চুনারুঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সীমান্তে গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা এর আগেও একাধিকবার ঘটেছে, যা নিয়মিতই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এবারের ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিজিবি ও পরিবারের বক্তব্যে যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, তা নিরসনে চূড়ান্ত তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





