ঢাকা, ২৩ আগস্ট: দেশের ৬৪ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকির দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপের মধ্যে। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই দায়িত্ব বণ্টনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। কাউকে দেওয়া হয়েছে একটি জেলা, আবার কাউকে দুই থেকে তিনটি জেলার ভার। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট জেলার আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং উন্নয়ন কার্যক্রম দেখভাল করবেন।
প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে দেশের বিভিন্ন জেলায় উন্নয়নের বরাদ্দ কাগজে-কলমে থাকলেও তা ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে। লুট করা অর্থের একাংশ পাচার হয়েছে বিদেশে, যা ইতিমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। আর বাকি অংশ দেশের ভেতরে মাদকসহ নানা সামাজিক অবক্ষয় এবং জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই জেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের এই দায়িত্ব দেওয়া হলো। সংবিধানের ৫৫ (২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে সিদ্ধান্তটি।
সিলেট বিভাগের চার জেলার দায়িত্ব ভাগ হয়েছে তিনজনের মধ্যে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে দেওয়া হয়েছে হবিগঞ্জের দায়িত্ব। মৌলভীবাজারের ভার পেয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। আর হুইপ জেকে গউছের কাঁধে পড়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ, দুই জেলার দায়িত্ব একসঙ্গে।
দায়িত্ব বণ্টনের পূর্ণাঙ্গ তালিকায় দেখা যায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ পেয়েছেন রাজশাহী ও নাটোর। আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের ভাগে পড়েছে লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড়, তিনটি জেলা। আবদুল আউয়াল মিন্টুকে দেওয়া হয়েছে শুধু লক্ষ্মীপুর। নিতাই রায় চৌধুরী পেয়েছেন চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব।
চট্টগ্রামের ভার পেয়েছেন মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দেখবেন শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা। আসাদুল হাবিব দুলুর দায়িত্বে থাকছে ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর, আর মো. আসাদুজ্জামানের কাঁধে পড়েছে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট।
এ ছাড়া জাকারিয়া তাহের পেয়েছেন ফেনী ও নোয়াখালী। মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দায়িত্ব সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের। সাচিং প্রু দেখবেন কক্সবাজার, আর মো. শরীফুল আলমের ভাগে পড়েছে টাঙ্গাইল ও নরসিংদী।
মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের দায়িত্ব পেয়েছেন শামা ওবায়েদ। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দেখবেন মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ। আব্দুল বারীর দায়িত্বে বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আর ঢাকা জেলার ভার পেয়েছেন সুলতান সালাউদ্দিন।
পার্বত্য তিন জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির দায়িত্ব একসঙ্গে পড়েছে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের কাঁধে। হাবিবুর রশিদ দেখবেন গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ। মো. রাজীব আহসানের ভাগে বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর, আর মীর শাহে আলমের দায়িত্বে রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম।
সিরাজগঞ্জ ও পাবনার দায়িত্ব পেয়েছেন ফারজানা শারমিন। শেখ ফরিদুল ইসলাম দেখবেন যশোর, মাগুরা ও নড়াইল। ইমরান খান চৌধুরীর ভাগে জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ, আর আহমেদ সোহেল মঞ্জুরের দায়িত্বে বরিশাল, ভোলা ও ঝালকাঠি।
মোহাম্মদ শামীম কায়সার পেয়েছেন জয়পুরহাট ও নওগাঁ। মো. জি কে গউছের দায়িত্বেও রয়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ। মিয়া নূরুদ্দিন আহমেদ দেখবেন রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ। আর তালিকার শেষে থাকা এ বি এম আশরাফ উদ্দিন অর্থাৎ নিজানের দায়িত্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চাঁদপুর।
প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বের ধরনও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপরা সংশ্লিষ্ট জেলার সরকারি দপ্তরগুলোকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পুরোনো অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, তাদের নজরদারিতে থাকবে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমও। প্রয়োজনে তারা জেলার বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিতে পারবেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
সব মিলিয়ে ৬৪ জেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই তদারকি কাঠামো সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। মাঠপর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি রোধে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে সবার।






