সুনামগঞ্জ, ১৭ আগস্ট: লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, টানা নয় দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় খাবার ও পানির সংকটে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরে মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সহযাত্রীরা সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন।
নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে এখনো তাদের বিস্তারিত পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। এ ঘটনায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত সাত যুবক নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন পাগলা শত্রুমর্দনের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা। ধারণা করা হচ্ছে, নিহত কয়েকজনের বাড়িও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। তবে তাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি ছিলেন বলে জানা গেছে।
যাত্রা শুরুর পর নৌকাটি তীব্র ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ফলে মাঝসমুদ্রে নৌকাটি ভাসতে থাকে।
এভাবে টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছে যায়। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী নৌকাটির যাত্রীদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্দুল করিম বলেন, ‘আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’
এদিকে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দূতাবাস জানায়, আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শরিফ এবং স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের বাদরান নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, তারা মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।
দূতাবাস আরও জানিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আহত বাংলাদেশি নাগরিকরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিশরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এ ঘটনায় শান্তিগঞ্জের বিভিন্ন পরিবারে নেমে এসেছে শোক ও উৎকণ্ঠা। নিখোঁজ সাত যুবকের স্বজনরা তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা গেলে পরিবারের সদস্যদের কাছে তাঁদের মৃত্যুর বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত মার্চে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় সুনামগঞ্জের ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।







