আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ১৫ আগস্ট: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, আছে এবং থাকবে। কখন প্রণালী বন্ধ বা খোলা হবে, সেই সিদ্ধান্তও তেহরানই নেবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
শুক্রবার নিউইয়র্কের পুলিশ একাডেমি সেন্টার ফর ট্রেনিং অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্সে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করতে যাচ্ছি।”
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হরমুজ প্রণালী “ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে”। তাঁর দাবি, ইরানের “কৌশলগত পরাজয়” মেনে না নেওয়া পর্যন্ত প্রণালীর ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকবে। কখন এটি বন্ধ বা খোলা হবে, সেই সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে বলেও জানান তিনি।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কেপলার ডেটা অনুযায়ী, শুক্রবার মাত্র দুটি জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে কোনো অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ছিল না। বৃহস্পতিবার নয়টি এবং বুধবার পাঁচটি জাহাজ প্রণালীটি পার হয়। অথচ আগস্ট মাসে গড়ে প্রতিদিন ১২টি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
৬২ জাহাজের গতিপথ বদল
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ কার্যকর করতে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তাদের বাহিনী ৬২টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এ ছাড়া তিনটি জাহাজ অচল করা এবং দুটি জাহাজে তল্লাশি চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেন, জাহাজ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মোতায়েনের মাধ্যমে এই অবরোধ “অনির্দিষ্টকাল” চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এদিকে অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৬৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮১ দশমিক ৪৯ ডলার।
বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর “অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা” আরোপের কথা বলেছেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের অধিকারের পথে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে শুক্রবার ইরানের পাঁচ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কানাডা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর বিষয়ে এখনো সম্মতি দেয়নি তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, কাতার ও পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রাখলেও এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত
পাকিস্তান ১৮ জুনের ইসলামাবাদ সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ওই সমঝোতাকে সংকট সমাধানের “একমাত্র পথ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে ইরাক হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিজেদের তেল রপ্তানির পথ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে।
ফলে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থান আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে তেহরান প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের দাবি জোরালো করছে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফেরার বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।







