সিলেট, ৯ আগস্ট: শুক্রবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরে দুই বাসের সংঘর্ষে নয়জনের প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে এই মহাসড়কের নিরাপত্তা সংকট। তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সিলেট অঞ্চলের আওতাধীন মহাসড়কে গত ছয় মাসে ঘটেছে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা, যাতে প্রাণ গেছে ১১৭ জনের। এই তথ্য জানিয়েছে সিলেট অঞ্চলের হাইওয়ে পুলিশ।
শুধু নিহতই নয়, এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৭৫ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ১০৯ জন। সংখ্যাগুলো একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে দিনে দিনে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মার্চে, মোট ৪১টি, যাতে নিহত হন ২৪ জন। এরপরই আসে মে মাস, ৪০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২২ জন। জুনে দুর্ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কম, ৩২টি হলেও নিহতের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ, ২৯ জন।
হাইওয়ে পুলিশের দেওয়া মাসভিত্তিক তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন। মার্চে ৪১টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২৪ জনের। এপ্রিলে ২৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন। মে মাসে ৪০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২২ জন। জুনে ৩২টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯ জনে, আর জুলাইয়ে ৩২টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৪ জনের। একই সময়ে সাধারণ আহত হয়েছেন ১৬৬ জন।
কিন্তু কেন বারবার ঘটছে এসব দুর্ঘটনা? স্থানীয় বাসিন্দা ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের বেপরোয়া গতিই মূল কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। যত্রতত্র পার্কিং, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা ভাসমান দোকান এবং হাটবাজারকেন্দ্রিক যানজটও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে সমানভাবে।
এই সমস্যা কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার নয়। মৌলভীবাজারের শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর, নবীগঞ্জের আউশকান্দি কিবরিয়া চত্বর, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্ট এবং সিলেটের ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারসহ একাধিক এলাকায় একই ধরনের চিত্র চোখে পড়ে।
গতির প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারিত আছে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা চালকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান তিনি। অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।
সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের কান্না, একেকটি অসম্পূর্ণ জীবন। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং কার্যকর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ওসমানীনগরের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সংকটের সাম্প্রতিকতম প্রকাশ, যার সমাধান এখন সময়ের দাবি।






