বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের দাম এখন অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রসেসর, স্টোরেজ, ডিসপ্লে, ব্যাটারি, পরিবহন ও আমদানি খরচসহ একাধিক কারণ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করা উপাদানগুলোর একটি হলো RAM বা DRAM চিপের সীমিত সরবরাহ।
এ-আই সার্ভার ও বড় ডেটা সেন্টারের জন্য প্রচুর পরিমাণে মেমোরি প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে বড় মেমোরি নির্মাতারা তুলনামূলক বেশি লাভজনক সার্ভার DRAM ও এ-আই কেন্দ্রিক মেমোরি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে সাধারণ কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে ব্যবহৃত RAM এর সরবরাহ কমে যাচ্ছে এবং দাম বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনের ChangXin Memory Technologies বা CXMT বিশ্ব মেমোরি বাজারে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান RAM সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের DDR6 বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চায়।
DDR6 এর জন্য কী প্রস্তুতি নিচ্ছে CXMT?
DDR6 এখনো সাধারণ কম্পিউটার বা ল্যাপটপে ব্যবহার শুরু হয়নি। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। বিভিন্ন শিল্প রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে DDR6-ভিত্তিক পণ্য বাজারে প্রবেশ করতে পারে।
তবে CXMT এখন থেকেই DDR6 মেমোরি প্যাকেজিং ও সরবরাহব্যবস্থা প্রস্তুত করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, DDR6 এর জন্য বর্তমান DDR4 ও DDR5 এর তুলনায় বেশি জটিল বহুস্তরবিশিষ্ট সাবস্ট্রেট প্রয়োজন হতে পারে। এই সাবস্ট্রেট হলো মেমোরি চিপের নিচে থাকা সূক্ষ্ম সার্কিট স্তর, যা চিপটিকে RAM মডিউলের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করে।
CXMT-এর সরবরাহকারী Haesung DS DDR5 সাবস্ট্রেট এর জন্য প্রতিষ্ঠানটির মান যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ভবিষ্যতের DDR6 এর জটিল নকশা উৎপাদনের জন্য প্রচলিত রিল-থেকে-রিল (reel-to-reel) পদ্ধতির পরিবর্তে প্যানেল-ভিত্তিক (panel-based) উৎপাদন নিয়ে কাজ করার কথাও জানা গেছে। এই প্রস্তুতি সফল হলে DDR6 বাজার চালু হওয়ার শুরুতেই CXMT বড় পরিমাণে মেমোরি সরবরাহের অবস্থানে থাকতে পারে।
বর্তমান RAM সংকট কতটা গুরুতর?
মেমোরি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান TrendForce ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ পূর্বাভাস দিয়েছিল, বছরের প্রথম প্রান্তিকে কনভেনশনাল ডি্রামের (DRAM) কন্ট্রাক্ট প্রাইস আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সময়ে PC DRAM এর দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়ার আশঙ্কাও করা হয়েছিল।
স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই ধরনের। TrendForce-এর মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে LPDDR4X মেমোরির গড় কন্ট্রাক্ট প্রাইস ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং LPDDR5X-এর দাম ৭৮ থেকে ৮৩ শতাংশ বাড়তে পারে। ফলে স্মার্টফোন নির্মাতারা বেশি RAM দেওয়ার পরিবর্তে অনেক মডেলে কম মেমোরি ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে।
জুলাইয়ের আরেকটি বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেও কনভেনশনাল ডি্রামের এরকন্ট্রাক্ট প্রাইস আরও ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে উচ্চ মেমোরি খরচের কারণে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের খুচরা দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।
তবে RAM চিপের দাম ৭০ বা ৮০ শতাংশ বাড়লেই একটি ফোন বা কম্পিউটারের মোট দাম একই হারে বাড়ে না। RAM একটি ডিভাইসের মোট উৎপাদন খরচের একটি অংশ মাত্র। কোন ডিভাইসে কত GB RAM ব্যবহার হচ্ছে এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের দাম কেমন, তার ওপর মোট মূল্যবৃদ্ধি নির্ভর করে।
CXMT কীভাবে বাজারে স্বস্তি আনতে পারে?
বর্তমানে Samsung, SK hynix ও Micron বিশ্ব DRAM বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বড় তিন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সিদ্ধান্তে পরিবর্তন হলে পুরো বিশ্বের কম্পিউটার ও স্মার্টফোন বাজারে তার প্রভাব পড়ে। CXMT বড় পরিসরে উৎপাদনে সফল হলে এই নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।
প্রথমত, মোট RAM সরবরাহ বাড়বে। বাজারে অতিরিক্ত DRAM চিপ এলে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন নির্মাতারা আরও বেশি মেমোরি সংগ্রহের সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয়ত, নির্মাতাদের বিকল্প সরবরাহকারী তৈরি হবে। একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎস থেকে মেমোরি কিনতে পারলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
তৃতীয়ত, মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। CXMT প্রতিযোগিতামূলক দামে গ্রহণযোগ্য মানের RAM সরবরাহ করতে পারলে অন্য নির্মাতাদের ওপরও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপ তৈরি হবে।
চতুর্থত, চীনের নিজস্ব চাহিদার একটি অংশ CXMT পূরণ করতে পারবে। এতে Samsung, SK hynix ও Micron-এর উৎপাদনের একটি অংশ অন্যান্য দেশের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশে সরাসরি CXMT RAM না এলেও বাড়তি উৎপাদনের পরোক্ষ সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?
বাংলাদেশের কম্পিউটার, স্মার্টফোন এবং অধিকাংশ যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে RAM এর দাম বাড়লে ডিভাইস নির্মাতাদের উৎপাদন খরচ বাড়ে। সেই বেশি দামে তৈরি পণ্য আমদানির পর পরিবহন, শুল্ক, কর ও ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হয়ে স্থানীয় বাজারে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
CXMT সফলভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ তিনভাবে উপকৃত হতে পারে:
* কম্পিউটার RAM ও ল্যাপটপ মেমোরির সরবরাহ বাড়তে পারে।
* তুলনামূলক কম দামের ফোন ও কম্পিউটার তৈরিতে ব্র্যান্ডগুলোর সুযোগ বাড়তে পারে।
* একটি নির্দিষ্ট দেশের বা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ সমস্যার প্রভাব কিছুটা কমতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক RAM এর দাম কমলেই বাংলাদেশের বাজারে একই দিনে দাম কমবে না। আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের কাছে আগে বেশি দামে কেনা পণ্য থাকতে পারে। নতুন কম দামের চালান বাজারে আসা পর্যন্ত সময় লাগবে। একই সঙ্গে ডলার বিনিময় হার, পরিবহন খরচ, আমদানি শুল্ক ও ব্র্যান্ডের মূল্যনীতি অনুকূলে না থাকলে RAM সস্তা হওয়ার পুরো সুবিধা স্থানীয় ক্রেতারা নাও পেতে পারেন।
CXMT-এর সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে
CXMT এর পরিকল্পনা আশাব্যঞ্জক হলেও সফলতা নিশ্চিত নয়। প্রতিষ্ঠানটিকে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রথমত, শুধু বেশি চিপ তৈরি করলেই হবে না। RAM-এর পারফরম্যান্স, স্থায়িত্ব, পাওয়ার ইফিসিয়েন্সি এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নতুন DDR6 প্যাকেজিং পদ্ধতিতে ভালো ত্রুটিহীন চিপ উৎপাদনের হার বাড়াতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং কম দামে RAM বিক্রি করা কঠিন হবে।
তৃতীয়ত, মাদারবোর্ড, প্রসেসর এবং যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে সামঞ্জস্যতার অনুমোদন (compatibility approval) লাগবে। বড় ব্র্যান্ডগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা না করে নতুন সরবরাহকারীর মেমোরি ব্যবহার করে না।
চতুর্থত, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ CXMT-এর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সীমিত করতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি চীনের বাজারে সফল হলেও সব দেশে একইভাবে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কী বলছেন রায়ান্স এর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা?
বাংলাদেশের অগ্রগামী প্রযুক্তিপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি Ryans Computers। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মনিটর, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য বিক্রি করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে RAM এর সরবরাহ ও মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ক্রেতাদের ওপর কীভাবে পড়ে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব বাজার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
রায়ান্স এর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, CXMT যদি রাজনৈতিক ও অন্যান্য জটিলতা এড়িয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী DDR6 মেমোরি তুলনামূলক দ্রুত বাজারে আনতে পারে এবং একই সঙ্গে পণ্যের মান, স্থায়িত্ব, কার্যক্ষমতা ও সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে RAM সরবরাহ বাড়তে পারে। নতুন একটি শক্তিশালী নির্মাতা যুক্ত হলে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং মেমোরির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
লেখকের পরিচয়
Md Meraj Mahmud
Content Writer & SEO Specialist
Ryans Computers LTD.







