স্মৃতির অন্তরালে এমসি কলেজ: ৮ জুলাইয়ের সেই ধ্বংসযজ্ঞ

স্মৃতির অন্তরালে এমসি কলেজ: ৮ জুলাইয়ের সেই ধ্বংসযজ্ঞ - Surma Times | Sylhet News

স্মৃতির অন্তরালে এমসি কলেজ: ৮ জুলাইয়ের সেই ধ্বংসযজ্ঞ - Surma Times | Sylhet Newsগোলজার আহমদ হেলাল: ৮ জুলাই ২০১২, সন্ধ্যার দিকে। এক বন্ধুর ফোন কল এসে জানাল, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে কী হয়েছে। ছাত্রাবাসের পাশেই আমার বাসা। পরিচিতজনদের কাছ থেকে খবর পেলাম, দুর্বৃত্তরা ছাত্রাবাসে আগুন দিয়েছে। ১ম ছাত্রাবাসে জীবনের এক-তৃতীয়াংশ কেটেছে। সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা অগ্নিকাণ্ডের খবরে চোখের জল সামলাতে পারিনি।

শতাব্দীর সবচেয়ে পুরনো এ মনুষত্ব বিকাশের কেন্দ্রে কেন এই হামলা? কেন এই নৃশংসতা? কেন এই বর্বরতা? কার স্বার্থে আঘাত করা হল এমসি কলেজ ছাত্রাবাসকে? বুঝে উঠতে পারিনি।

১৯৯২ সালে এসএসসি পাস করে অনেক স্বপ্ন নিয়ে এমসি কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। ২৪ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনী ক্লাসের দিন দুটি ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষে কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় মাসখানেক পর কলেজ আবার খোলে। নতুন পরিবেশ, নামী প্রতিষ্ঠান—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি। বয়সে ছোট হওয়ায় সবাই আমাকে স্নেহ করতেন। বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষিকা আমাকে বেশ কয়েকটি বই উপহার দিয়েছিলেন।

ইন্টারমিডিয়েট থেকেই ছাত্রাবাসে থাকতাম। প্রায় সুদীর্ঘ ১০ বছর ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, ঘটনা-দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু ৮ জুলাই ২০১২-এর ধ্বংসযজ্ঞ এ যাবতকালের সকল ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে হার মানিয়েছে।

এমসি কলেজ ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত। সিলেটের জমিদার রাজা গিরিশ চন্দ্র সেন নিজ মাতামহ মুরারী চাঁদ রায়ের নামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সৈয়দ আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়ার উদ্যোগে এটি সরকারি প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। ইংরেজ গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিচের ভূমিকায় বর্তমান ক্যাম্পাস টিলাগড়ে স্থানান্তরিত হয়। এ প্রতিষ্ঠান অনেক জ্ঞানী-গুণী ও কীর্তিমান মানুষের জন্ম দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানসহ অনেক কীর্তিমান এখান থেকে বেরিয়েছেন। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক গুণী ব্যক্তি এখানে এসেছেন। জিন্নাহ সাহেব এ ক্যাম্পাসকে ‘প্রাচ্যের পুষ্প’ বলে অভিহিত করেছেন।

৯৩ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যাদের উপর লজ্জা দূর করবার ভার দিয়েছিলেন, তাদের অযোগ্য উত্তরসূরীরা গোটা সিলেটবাসীকে লজ্জায় ডুবিয়ে ঐতিহ্যের স্মারক এ কলেজের ছাত্রাবাসটি জ্বালিয়ে দেয়। দাউ দাউ আগুনে পুড়ে যায় সুপ্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত নান্দনিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত বিশ্বের বুকে এ ধরনের সবচেয়ে বড় স্থাপনা।

এমসি কলেজ ছাত্রাবাস প্রেমিক হৃদয়গুলোতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা কখনও দূরীভূত করা যাবে না। সিলেটবাসীর হৃদয়ে আজ রক্তক্ষরণ। এ রক্তক্ষরণ শেষ হবার নয়।

এই মর্মন্তুদ ঘটনাকে শতাব্দীর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ বললেও অত্যুক্তি হবে না। ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়। যে মা-বাবা বুক ভরা আশা নিয়ে সন্তানকে পাঠাতেন এ কলেজ ছাত্রাবাসে, তাদের জবাব কী? গোটা উপমহাদেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এ ছাত্রাবাসে পড়াশোনার যে নৈসর্গিক ও ঐতিহ্যমণ্ডিত পরিবেশ ছিল তা কোন অশুভ শক্তির রোষানলে পড়লো?

উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে সচেতন মহল আশা প্রকাশ করে। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় প্রিয় এমসি কলেজ ছাত্রাবাস। নান্দনিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত মনোমুগ্ধকর এ ক্যাম্পাসে জীবনের স্বপ্নিল সোনালি সময়ের সুদীর্ঘকাল কাটিয়েছি।

এমসি কলেজ জন্ম দেয় সোনালি সন্তান। এর পাদপীঠে হাজারো ঐতিহ্য, হাজারো দেশমাতৃকার স্বাধিকার আন্দোলনের পদচিহ্ন লুকায়িত আছে সবুজ ঘাসের বুকে।

লেখক:সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
(১৫/০৭/২০১২ ইংরেজীতে লিখিত।)

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article