মৌলভীবাজার, ২০ সেপ্টেম্বর: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি বসতঘরের খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১৬ ফুট লম্বা একটি অজগর সাপ। পরে সেটি হস্তান্তর করা হয় স্থানীয় বন বিভাগের কাছে। শনিবার শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, শুক্রবার রাত সোয়া ১২টার দিকে উপজেলার ইছবপুর এলাকায় মিতালি ডেকোরেটার্সের মালিক প্রয়াত হারুন মিয়ার বাসা থেকে অজগরটি উদ্ধার করা হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, রাতে বাড়ির সবাই যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পরিবারের একজন সদস্য হঠাৎ শুনতে পান খাটের নিচ থেকে ভেসে আসা ‘হিস হিস’ শব্দ। মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালাতেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির এক অজগর। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিবারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনা জানানো হয় স্থানীয় চিকিৎসক প্রলাদ বাবুকে। তিনিই খবর দেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যদের। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ। তাঁরাই খাটের নিচ থেকে অজগরটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। উদ্ধার হওয়া সাপটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ ফুট এবং ওজন প্রায় ২৬ কেজি বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক জোহরা মিলা। তিনি জানান, অজগর আসলে নির্বিষ সাপ। নিশাচর স্বভাবের এই প্রাণী খুবই অলস প্রকৃতির, প্রয়োজন ছাড়া নড়াচড়াও করে না বললেই চলে। সাধারণত গাছে একাকী বাস করলেও প্রজননকালে জোড়া বাঁধে অজগর, আর এই প্রজননকাল সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে ঘটে থাকে। দেশের ম্যানগ্রোভ বন, ঘাসযুক্ত জমি এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটের চিরসবুজ পাহাড়ি বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে। মিলার ভাষ্যে, সাপটি সাধারণত মানুষের ক্ষতি করে না, বরং খাদ্য হিসেবে এরা ইঁদুর, কচ্ছপের ডিম, সাপ, বন মুরগি, পাখি ও ছোট বন্যপ্রাণী খেয়ে থাকে। এমনকি নিজের আকারের চেয়েও অনেক বড় প্রাণী অনায়াসে গিলে ফেলার সক্ষমতাও রয়েছে এই সাপের।
তবে উদ্বেগের কথাও জানান জোহরা মিলা। তিনি বলেন, চামড়ার জন্য সাপটি পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বনাঞ্চল থেকে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রজাতি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ এর তফসিল-২ অনুযায়ী এই প্রাণীটি সংরক্ষিত, ফলে একে হত্যা করা বা কোনো ধরনের ক্ষতি করা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো বন্যপ্রাণী চোখে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে হত্যা না করে বন বিভাগ বা ফাউন্ডেশনকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় বার্তায়। এই ঘটনা যেমন একদিকে বন্যপ্রাণীর প্রতি জনসচেতনতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে, তেমনি সংরক্ষিত প্রজাতি রক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনেছে।





