ঢাকা, ২৯ জুলাই: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বাজেটে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দক্ষ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিবিইউবিটি) ইকোনমিক্স ক্লাবের উদ্যোগে বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন হলে অনুষ্ঠিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের পরবর্তী বিশ্লেষণ ও বাংলাদেশ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির করণীয় নিয়ে আয়োজিত এ সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিবিইউবিটির ব্যবসায় ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাসুদ হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ সম্পদ বণ্টন, আয় বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে বিনিয়োগযোগ্য মূলধনের প্রধান উৎস চিহ্নিত করা জরুরি। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে এখন বাহ্যিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন ও টেকসই উন্নয়নের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি প্রস্তুত পোশাক শিল্পে টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রপ্তানি আয়ের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রকৃত অর্থে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাসুদ হোসেন বলেন, জাতীয় বাজেটের পরবর্তী বিশ্লেষণ দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের আলোচনা টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও নীতিগত অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে বলেন, বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে না দিয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার আওতায় স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্তভাবে পরিচালনা করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি মুদ্রাস্ফীতির চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় বাজেটের গুরুত্বের বিষয়েও আলোকপাত করেন।
ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি গড়ে তোলার বিষয়ে অধ্যাপক মাহবুব আলী বলেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লকচেইন এবং ডিপ লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তার মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর নতুন বাস্তবতায় কর্মসংস্থানযোগ্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা অপরিহার্য।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এ ধরনের একাডেমিক উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তরিক ইমাম জাহিদ, সহকারী অধ্যাপক মো. রাকিবুল ইসলাম এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুন্সী মাহবুবুর রহমান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন অংশীজন জাতীয় বাজেট, রাজস্ব নীতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেন। আলোচকরা সর্বসম্মতভাবে মত দেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দক্ষ বাস্তবায়ন, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।






