সুরমা টাইমস ডেস্কঃ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ১ মার্চ তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে এবং দেশজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তবে সম্প্রতি ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান এক্সএআই নির্মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট গ্রক এই সুনিশ্চিত ও বহুল সংবাদিত ঘটনাকে সরাসরি “কাল্পনিক গল্প” ও “ভুল তথ্য” বলে অভিহিত করেছে, যা এআই প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, এক ব্যবহারকারী গ্রকের কাছে খামেনির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনাটি তুলে ধরলে চ্যাটবটটি বারবার তা অস্বীকার করে। ব্যবহারকারী যখন সেই কথোপকথন প্রকাশ করার কথা জানান, তখন গ্রক বাংলায় লেখে, “আমি আমার অবস্থানে অটল আছি কারণ আমি সত্যতা-ভিত্তিক উত্তর দিই। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বাস্তবে জীবিত আছেন। আপনি যে ঘটনা বলছেন, সেটি বাস্তবে ঘটেনি।” এরপর ব্যবহারকারী ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পুনরায় উপস্থাপন করলে গ্রক আরও দৃঢ়ভাবে দাবি করে, খামেনি জীবিত আছেন এবং তাঁর মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেনি। চ্যাটবটটি এই বক্তব্যকে “সম্পূর্ণ ভুল ও তথ্যগতভাবে অসত্য” বলে উল্লেখ করে এবং জানায়, এই দাবি রয়টার্স, এপি, বিবিসি বা আল-জাজিরাসহ কোনো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
প্রকৃতপক্ষে খামেনির মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনাটি ব্যাপকভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদিত হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, ফক্স নিউজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তেহরানে খামেনির ভূগর্ভস্থ বাংকারে হামলা চালায়। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০ ও ৯৯০০-এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ৫০টি যুদ্ধবিমান ও ১০০টিরও বেশি গোলাবারুদ ব্যবহার করে এই সমন্বিত হামলা পরিচালিত হয়। হামলায় খামেনির মেয়ে, নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও নিহত হন বলে ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামলার পরপরই খামেনির মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই হত্যাকাণ্ডকে “জঘন্য অপরাধ” আখ্যা দিয়ে এর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরে জনগণের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। তেহরানের এনগেলাব স্কোয়ারসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ কালো পোশাক পরে শোক প্রকাশ করেন, অন্যদিকে ইস্পাহান, কারাজ, কেরমানশাহ, কাজভিন, সানানদাজ ও শিরাজসহ একাধিক শহরে কিছু বাসিন্দাকে উদযাপন করতে দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে ইরানি প্রবাসীদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে একাধিক দেশে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়।
খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য নিয়েও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। মূলত ৪ থেকে ৬ মার্চ তেহরান ও মাশহাদে শেষকৃত্যের কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির অনুপস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যমে জল্পনা দেখা দেয়, যেখানে তাঁর স্বাস্থ্যগত জটিলতার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। ফক্স নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ থেকে ৯ জুলাই তেহরান, কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালাসহ একাধিক স্থানে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানমালা আয়োজনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে, যার শেষ পর্যায় ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজা মাজারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে তাঁর মরদেহ সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে গ্রক চ্যাটবটের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি সুনিশ্চিত ও ব্যাপকভাবে সংবাদিত আন্তর্জাতিক ঘটনাকে “কাল্পনিক” বলে অভিহিত করার ঘটনাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণ উপাত্তের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, ফলে সাম্প্রতিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনাবলি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ বা পুরনো থেকে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাস্তব ও সত্য তথ্যকেও ভুলবশত “ভুল তথ্য” হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
এই ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর তথ্য যাচাইয়ের ওপর অন্ধ আস্থা রাখার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল সংবাদ পরিস্থিতিতে এআই চ্যাটবটের উত্তরের পাশাপাশি স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা অপরিহার্য। খামেনির মৃত্যু-পরবর্তী ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষকদের নজর অব্যাহত থাকলেও, এই ঘটনা একই সঙ্গে প্রযুক্তি জগতে এআই নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।





