ঢাকা, ২১ জুলাই — ডিপফেক, ভুয়া তথ্য (ডিসইনফরমেশন), মিথ্যাচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইনজীবী প্যানেল গঠনের সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি বাকি রয়েছে, যা আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ডিপফেক, মিথ্যাচার ও সাইবার বুলিং কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
ডা. জাহেদ বলেন, সরকার শুরু থেকেই তথ্যের অপব্যবহার, বিশেষ করে ডিসইনফরমেশন ও সাইবার বুলিংকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, অপপ্রচার, ছবি-ভিডিও বিকৃত করে প্রচার এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটাচ্ছে না, বরং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি ও মানুষের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন এবং শুধু নারী হওয়ার কারণেই অনেককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপমান, হুমকি ও মিথ্যা প্রচারণার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি জানান, গঠিতব্য আইনজীবী প্যানেল শুধু অভিযোগ পাওয়ার পরই নয়, প্রয়োজনে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারবে। এর মূল উদ্দেশ্য সাধারণ নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া। তিনি নাগরিকদের আহ্বান জানান, কেউ সাইবার বুলিং, ডিপফেক, মিথ্যা তথ্য বা অনলাইন হয়রানির শিকার হলে যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানান। তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় যাচাই-বাছাইয়ের একটি প্রক্রিয়া থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেমন ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হওয়া এবং তথ্য-ছবি যাচাই ছাড়া শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে জাহেদ উর রহমান জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ২১৮ জন, যেখানে এবার তা ১০ হাজার ৮৫৭ জনে নেমে এসেছে। একইভাবে মৃত্যুর সংখ্যাও কমে গত বছরের ৬২ জনের তুলনায় এবার হয়েছে ৩৭ জন। প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রবাসী কার্ড
জ্বালানি খাতের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ৪০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত ১৫০টি কূপের মধ্যে ইতিমধ্যে ২৯টি খনন সম্পন্ন হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন নিশ্চিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১২৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাকি কূপ খনন সম্পন্ন করে আরও প্রায় ১ হাজার ৪৯১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার ‘নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা-২০২৬’ জারি করেছে, যার আওতায় খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বাজার তদারকিও অব্যাহত রয়েছে এবং দেশের খাদ্য মজুদ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার ও আগামী বছরের জুনের মধ্যে দুই লাখ প্রবাসীর হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা অন্তত ১০ ধরনের সেবা সহজে পাবেন বলে তিনি জানান।
পরিবেশ ও শিল্প খাত
পরিবেশ রক্ষা প্রসঙ্গে তিনি জানান, পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন বাজারে স্বল্পমূল্যে পাটের ব্যাগ বিতরণ করা হচ্ছে, পাশাপাশি পরিবেশদূষণকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে।
শিল্প খাত নিয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি মিলের মধ্যে ১৬টি মিল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির চাপ কমবে এবং বিদ্যমান কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে।
সবশেষে জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সচেতন সমাজ গড়তে সরকার যেমন প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে, তেমনি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।






