ভারী বর্ষণে বন্যা-জলাবদ্ধতা: জলবায়ু সংকট ও অব্যবস্থাপনার দ্বৈত বাস্তবতা

ভারী বর্ষণে বন্যা-জলাবদ্ধতা: জলবায়ু সংকট ও অব্যবস্থাপনার দ্বৈত বাস্তবতা - Surma Times | Sylhet News

ভারী বর্ষণে বন্যা-জলাবদ্ধতা: জলবায়ু সংকট ও অব্যবস্থাপনার দ্বৈত বাস্তবতা - Surma Times | Sylhet Newsঢাকা, ১২ জুলাই ২০২৬: বাংলাদেশে বর্ষা একসময় ছিল প্রকৃতির পুনর্জাগরণের প্রতীক। নদ-নদী ভরে ওঠা, কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং জনজীবনে স্বস্তির আবহ ছিল এ ঋতুর স্বাভাবিক চিত্র। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র পাল্টে গিয়ে বর্ষা ক্রমেই দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীসহ বড় শহরগুলো অচল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টিতে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যাকবলিত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই সংকট কি কেবল প্রাকৃতিক, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নও দায়ী।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় মৌসুমি বন্যা এখানে নতুন কিছু নয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ অসংখ্য নদীর প্রবাহপথে অবস্থিত হওয়ায় বর্ষা এ দেশের বাস্তবতা। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টি হলেও এখন স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি এবং নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়ালেও তা বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে।

নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ বড় শহরগুলোতে বর্ষা এলেই সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়, যানজট তীব্র হয় এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এতে ব্যক্তিগত দুর্ভোগের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। গত কয়েক দশকে শহর সম্প্রসারণের নামে খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করা হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, নালা পরিষ্কারের অভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে অস্থায়ী উদ্যোগই বারবার দেখা যাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলেও বন্যার প্রভাব ভয়াবহ। আকস্মিক বন্যায় ফসল নষ্ট, মাছের ঘের ভেসে যাওয়া, গবাদিপশুর ক্ষতি এবং খাদ্যসংকট সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়। বিশুদ্ধ পানির অভাব, স্যানিটেশন সমস্যা এবং পানিবাহিত রোগ জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নাগরিক আচরণও এ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্লাস্টিক ও বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে ড্রেন ও নালা বন্ধ হয়ে যায়, যা জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে দেয়। পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাব সমস্যাকে আরও তীব্র করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য। নগর পরিকল্পনায় জলাধার ও খাল সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, আধুনিক ড্রেনেজ ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, নদ-নদী দখলমুক্ত করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং জলাভূমি রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির প্রসার প্রয়োজন।

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কৃষকদের সহায়তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

প্রতিবছর বর্ষা আসবে, বৃষ্টিও হবে। তবে সেই বৃষ্টি যেন দুর্ভোগের কারণ না হয়ে আশীর্বাদে পরিণত হয়, তা নিশ্চিত করা মানুষেরই দায়িত্ব। পরিকল্পিত নগরায়ণ, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সচেতনতা এবং দৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমানো সম্ভব। অন্যথায় এটি কেবল মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের বড় বাধা হয়ে উঠবে।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক

দৈনিক সিলেটের ডাক

মোবাইল নং- 01712-482506

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article