ঢাকা, শনিবার (৪ জুলাই): উন্নত জীবনযাত্রা, বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা ও দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর বহু শিক্ষার্থী দেশটিতে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখলেও কঠোর অভিবাসন নীতি ও নিখুঁত কাগজপত্র যাচাইয়ের কারণে স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে জটিল বলে মনে হয়।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইজারল্যান্ডের ভিসা প্রক্রিয়া মূলত কঠিন নয়, বরং অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ ও নথিপত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারলে ভিসা প্রাপ্তি তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
ভিসা আবেদনের প্রথম শর্ত হলো সুইজারল্যান্ডের স্বীকৃত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিশ্চিত ভর্তির অনুমোদন বা আনকন্ডিশনাল লেটার অব অ্যাকসেপ্টেন্স। দেশটিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ইটিএইচ জুরিখ (ETH Zurich), ইপিএফএল (EPFL) ও ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেলে ভিসা আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে আবেদনকারীর পূর্ববর্তী পড়াশোনার সঙ্গে নির্বাচিত কোর্সের যৌক্তিক সামঞ্জস্য থাকা জরুরি, অন্যথায় ভিসা কর্মকর্তারা উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ সুইজারল্যান্ডের স্টুডেন্ট ভিসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীকে প্রতি বছরের জন্য কমপক্ষে ২১ হাজার থেকে ২৪ হাজার সুইস ফ্রাংক, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা, ব্যাংকে প্রদর্শন করতে হয়। শুধু অর্থের উপস্থিতি নয়, এর উৎসের স্বচ্ছতা ও বৈধতা প্রমাণ করাও বাধ্যতামূলক। স্পন্সরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আয়কর নথি ও স্থায়ী আমানতের কাগজপত্রে কোনো অসঙ্গতি থাকলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্পন্সর বা গ্যারান্টরের বিষয়েও সুইজারল্যান্ডের অবস্থান ভিন্ন। আবেদনকারীর নিজস্ব বা পারিবারিক অর্থ পর্যাপ্ত না হলে স্পন্সর প্রয়োজন হয়। তবে যেকোনো আত্মীয়ের স্পন্সরশিপ গ্রহণযোগ্য নয়। সুইজারল্যান্ডের নাগরিক বা সেখানে বৈধভাবে বসবাসকারী ‘বি’ বা ‘সি’ পারমিটধারী কেউ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিক্লেরেশন অব গ্যারান্টি’ প্রদান করেন, তা অধিক গুরুত্ব পায়।
ভাষাগত দক্ষতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইংরেজি মাধ্যমে কোর্সের ক্ষেত্রে আইইএলটিএস স্কোর ৬.৫ থেকে ৭.০ থাকা প্রয়োজন এবং কোনো ব্যান্ডে ৫.৫ বা ৬.০-এর নিচে না থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যদিকে জার্মান বা ফ্রেঞ্চ ভাষার কোর্সের জন্য টেস্টডাফ (TestDaF) বা ডিইএলএফ (DELF)-এর মতো স্বীকৃত সনদ প্রয়োজন। ভালো ভাষা দক্ষতা ইন্টারভিউয়েও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
এছাড়া মোটিভেশন লেটার বা স্টেটমেন্ট অব পারপাস ভিসা প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে আবেদনকারীর শিক্ষাগত লক্ষ্য, সুইজারল্যান্ড বেছে নেওয়ার কারণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হয়। বিশেষ করে পড়াশোনা শেষে নিজ দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা জরুরি, অন্যথায় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
স্বাস্থ্যবীমা ও আবাসনের বিষয়েও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর স্থানীয় সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান যেমন সিএসএস (CSS) বা হেলসানা (Helsana)-এর অধীনে স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণ বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি থাকার জায়গার প্রাথমিক প্রমাণ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনের বুকিং কাগজপত্রও প্রয়োজন হয়।
ভিসা প্রক্রিয়াটি দ্বিমুখী হওয়ায় সময় ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার সুইস দূতাবাস আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট ক্যান্টনের ইমিগ্রেশন অফিসে পাঠায় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সাধারণত ৮ থেকে ১২ সপ্তাহ সময় লাগে। ফলে সেপ্টেম্বর ইনটেকের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৬ মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন এবং প্রায় ৪ মাস আগে ভিসার প্রস্তুতি শুরু করা উচিত।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা, নির্ভুল কাগজপত্র ও সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে পারলে সুইজারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার পথ অনেকটাই সুগম হয়ে উঠতে পারে।




