পিযুষ চক্রবর্তীঃ পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যালয়টি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের পুরন্দরপুর গ্রামে অবস্থিত। হাওরাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে এ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এ বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জনপদের ইতিহাস। এটি মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক। ধীরে ধীরে এই আলোর দিশারী মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে গৌরবের বাতিঘর। আজ এটি একটি অনুভূতি; যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গভীরভারে প্রোথিত হয়েছে।
১৯২৬ সালে এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। গ্রামবাংলায় শিক্ষার আলো ছিল খুবই ক্ষীণ। তখন গ্রামের শিক্ষানুরাগী মানুষের প্রচেষ্টায় এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁদের ত্যাগ ও শ্রমে গড়ে উঠে এই প্রতিষ্ঠান। এটি ছিল একটি সামাজিক ও আলোকিত উদ্যোগ। শিক্ষা বিস্তারের একটি সাহসী পদক্ষেপ। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বিদ্যালয়টি গ্রাম তথা এলাকার মানুষের আস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠে। পুরন্দরপুরের ছাত্র-ছাত্রী ব্যাতিতও এলাকার আলীপুর, দুর্লভপুরসহ অন্যান্য গ্রাম থেকে আত্মীয়কে ভর করে অনেকেই এই বিদ্যালয়ে শিক্ষা ও পাঠদান গ্রহণ করেন।
প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয় সংখ্যা ও শিক্ষার্থী যথেষ্ট না থাকলেও ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টি বড় হয় এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিক্ষক বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার মানও উন্নত হতে থাকে। এই প্রাথমিক পাঠশালাটি শুধু পাঠ্যপুস্তককেন্দ্রিক শিক্ষা দেয়নি; এটি মানুষ গড়ার কাজও করেছে। এখানে শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা শেখানো হয়েছে, দায়িত্ববোধ
গড়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজ সচেতনতা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করা হয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জীবনের পথে আলোকবর্তিতা হয়ে কাজ করেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এই বিদ্যালয় থেকে বহু কৃতি মানুষ তৈরি হয়েছে। জ্ঞানী-গুণী বহু মানুষ তৈরি হয়েছেন; যাঁরা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এমনকি প্রবাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কেউ প্রশাসনে কাজ করছেন, কেউ চিকিৎসাক্ষেত্রে অবদান রাখছেন, কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন, কেউ লেখালেখি ও গবেষণা করছেন। বিশেষ করে ব্যক্তিজীবনে আমি প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথম স্থান অর্জন করাসহ সেন্টার ও বৃত্তি পরীক্ষা দিতে উৎসাহবোধ করেছি। মা-বাবা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহব্যঞ্জক কথার আলোকে আমি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বিদ্যাপীঠ এমসি (মুরারি চাঁদ) কলেজে ¯œাতকোত্তর ও সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করি। এরপর সিলেটের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় কিছুকাল আত্মনিয়োগ করি। এছাড়া গণমাধ্যমে লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ সচেতনতার মতো মহান কাজটিতেও অবদান রাখছি। আজও মনে পড়ে পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক বাবুলাল তালুকদার স্যারের নীতি-আদর্শমূলক ও উৎসাহব্যঞ্জক বক্তব্য এবং পাঠদান। মতিলাল স্যারের নীতিকথা ও পাঠাভ্যাসে শাসনভীতির আলোকে পড়া শিখে যাওয়া। এছাড়া নিবারণ তালুকদার স্যারের নিত্যদিনের পতাকা উত্তোলন, পিটি করানো, সকল ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি চুল ও নখ ছোট রাখার প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন। এসবের ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনে শাস্তিও দিতেন। বোর্ডে নিয়ে এক এক করে চক দিয়ে বানানশুদ্ধিও যাচাই করতেন। ইংরেজি বাক্যকে বাংলায় ও বাংলা বাক্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করাতেন। প্রতিদিন জাতীয় সংগীত গাওয়া সকল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। দেশ সমাজ ও জাতীয়তা সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞানের অনেক কিছু মুখে মুখে বলতেন ও শেখাতেন। কখনও খেলাধুলা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহ দিতেন। তিনি একজন রেফারিও ছিলেন। বদলিজনিত কারণে বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। অবসর নেওয়ার পূর্বমুহূর্তে নিজ গ্রামের বিদ্যালয় পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। বিশেষ করে শিক্ষক তৈরির উৎসাহে পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গ্রামটি অনুপ্রেরণাব্যঞ্জক। এলাকার ভাটিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, রফিনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, রাজানগর উচ্চ বিদ্যালয়, জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, চরণারচর মডেল স্কুল, মির্জাপুর প্রাইমারি স্কুল, রাউতলা প্রাইমারি স্কুলসহ বিভিন্ন বিদ্যাপীঠে পুরন্দরপুরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা করে গ্রাম ও বিদ্যালয়ের সুনাম এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। গ্রামে বিদ্যালয় থাকাতে পড়াশোনায় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা ছিল। বৃটিশ শাসনামলে ঠাকুরবাড়ির কামিনীমোহন চক্রবর্তী হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে রাজানগর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন।
প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, রাজানগর হাইস্কুল দিরাই উপজেলার সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুল। এছাড়া সিলেটের এমসি কলেজ থেকে বৃটিশ আমলে কালীচরণ সরকার বিএসসি ডিগ্রি ও প্রেমানন্দ সরকার ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে এলাকার রফিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মতো মহান পেশা থেকে দু’জনেই অবসর নেন। স্বল্প বেতনে ও অবৈতনিকভাবে পাঠদান করেছেন গ্রামের সন্তান, গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থী কালীচরণ মাস্টার ও গৌড়চরণ মাস্টার। এমনকি লোকমুখে শোনা যায়, পুরন্দরপুর গ্রাম ও সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিবেকানন্দ তালুকদার জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সনামধন্য শিক্ষক ছিলেন। তার এক ছেলে উপ-সচিব, এক ছেলে প্রকৌশলী ও এক ছেলে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মোটকথা, পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি একটি মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র।
শুরুতে পুরন্দরপুর পাঠশালা, পরে পুরন্দরপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এরপর পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ হয়। দেশপ্রেমে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও ছিল যথেষ্ট। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে এই বিদ্যালয়ের কিছু কিছু শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। যাঁদের আত্মত্যাগে দেশ স্বাধীন হয়েছে, ইতিহাস গড়েছে। এই ইতিহাস গৌরবের। এলাকার অন্যান্য গ্রামের প্রবীণদের কাছ থেকে শোনা যায়, পুরন্দরপুর গ্রাম বৃটিশ শাসনামল থেকেই শিক্ষায় অগ্রসর; এর নেপথ্যে পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া কালিয়াগোটা হাওর ও পাকনার হাওর তথা চুনাই নদীর মাছ খেয়ে পুরন্দরপুরের মানুষ বিদ্যাশিক্ষায় ভীষণ মেধাবী। বিদ্যালয় ও শিক্ষকের ভূমিকায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে গ্রাম তথা এলাকার অনেক মানুষ। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বেশিরভাগই কৃষক, তবুও তারা গর্ববোধ করতেন আমাদের গ্রামে ও এলাকায় প্রাচীন একটি বিদ্যাপীঠ রয়েছে। ছেলে-মেয়েরা অনন্ত পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। তৎকালীন সময়ে অনেক গ্রামে প্রাইমারি স্কুল ছিল না। পুরন্দরপুর বিদ্যালয়ে শুরু থেকেই শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের সময় নিবারণ স্যার শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতির খোঁজ-খবর নিতেন। কেউ অনুপস্থিত থাকলে ক্লাস ক্যাপ্টেন দ্বারা তাকে স্কুল নিয়ে আসতেন। গ্রামের শিক্ষক বিধায় অনেক অভিভাবককে বলতেন, তোমার ছেলে বা মেয়ে স্কুলে কেন আসলো না? কাল থেকে যেন স্কুল মিস না হয়। আগেকার শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেননি; তাঁরা জীবন গঠনের পথ দেখিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে চলতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁদের শাসন ও ¯েœহ একসাথে কাজ করেছে। এ ধরণের শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি। ব্যক্তিগত জীবনের অনেক স্মৃতি এই বিদ্যালয়ের সাথে জড়িত। শৈশবের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও মূল ভিত্তি। এখানে পড়শোনার পাশাপাশি জীবনের দিকনির্দেশনা শিখতে পারা যায়। বন্ধু, শিক্ষক এবং পরিবেশ- সব মিলিয়ে একটি সুন্দর সময় তৈরি হয়। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ, খেলার মাঠ, পরীক্ষার প্রস্তুতি সবই স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে। শিক্ষকদের কথা আজও মনে পড়ে। তাঁদের শেখানো প্রতিটি বিষয় জীবনের কাজে লাগে। এই বিদ্যালয় শুধু জ্ঞানভা-ার সমৃদ্ধই করেনি জীবনব্যাপী পথপ্রদর্শকও বটে। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক রয়েছেন, গ্রামের ঠাকুরবাড়ির মনি চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, ‘আমি আগে পাশর্^বর্তী গ্রামের আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিলাম। মাসখানেক আগে বদলি নিয়ে এ বিদ্যালয়ে এসেছি।’ তিনি সহকারী শিক্ষিকা। প্রধান শিক্ষক নেই, নেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক; যা অত্যন্ত দুঃখজনক এই যুগে। এছাড়া সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনেরও নেই প্রয়োজনীয় সুবিধা। অথচ দেশ অগ্রগতির পথে হাঁটছে। এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
বিদ্যালয়টি তার গৌরবময় অতীত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের দিকে। বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়; এটি একটি অনুভূতি। এটি একটি পরিচয়, এটি একটি ইতিহাস। এই বিদ্যালয় আমাদের জীবনের অংশ ও গর্বের প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এই বিদ্যালয়ের শতবর্ষ হোক আমাদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও সম্মিলিত অঙ্গীকার।
প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, বিদ্যালয়টি গ্রামের ঐক্যের প্রতীক। পুরন্দরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি ব্যবস্থাপনায় উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হোক গৌরবময় ভবিষ্যৎ ও সমুজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে- এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক: কলামিস্ট।
মোবা: ০১৭৫৪-৪০৩৮৫৩





