সিলেট, ১ সেপ্টেম্বর: সোমবার সকালে ঢাকা থেকে সিলেটমুখী বিমানের একটি ফ্লাইট উড্ডয়নরত অবস্থায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝ আকাশ থেকে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার সেই ঘটনার বিস্তারিত ও কৌতূহলোদ্দীপক বর্ণনা এবার নিজের ফেসবুকে তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন। মঙ্গলবার প্রকাশিত সেই পোস্টে ঘটনার আদ্যোপান্ত যেমন উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে যাত্রীদের নানা প্রতিক্রিয়া ও একজন যাত্রীর মজার এক ভূমিকার কথাও।
খোকন জানান, ৩১ আগস্ট সকাল ১১টার ওই ফ্লাইটে ওঠার সময় বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা তার কাছে চমৎকার মনে হয়েছিল। বিমানবন্দরের কাউন্টারে তখন আরও তিনটি বেসরকারি সংস্থার বিমানও সিলেটগামী যাত্রীদের ডাকছিল, যা দেখে তার মনে হয়েছিল সিলেটের মানুষ এখন সড়কপথের ঝক্কি এড়িয়ে আকাশপথকেই বেছে নিচ্ছেন। যথারীতি উড়াল দেয় তাদের ফ্লাইটও। বিমানে ছিলেন প্রায় বিশজন যাত্রী, যাদের অনেকেই একে অপরের সঙ্গে জোরে কথা বলছিলেন, আলাপের বিষয় ছিল মধ্যপ্রাচ্যের চাকরি থেকে শুরু করে সরকারি অফিসের নানা প্রসঙ্গ।
মিনিট বিশেক ওড়ার পর হঠাৎ পাইলটের কণ্ঠ ভেসে আসে মাইক্রোফোনে। প্রথমে উৎসাহিত হয়ে ওঠা খোকন ভেবেছিলেন হয়তো কোনো সুখবর আসছে, কিন্তু পাইলট জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফ্লাইটটি আবার শাহজালাল বিমানবন্দরে ফিরে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় বিমানের ভেতরের পরিবেশ। সামনের আসনে বসা এক নারী দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন, পাশের আসনের আরেকজন মন্ত্র জপ করতে থাকেন। খোকনের ভাষায়, তখন ধর্ম-বর্ণের সব বিভাজন যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল, সবাই নিজ নিজ পদ্ধতিতে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন।
এই উত্তেজনার মধ্যেই পেছন থেকে চিৎকার করে ওঠেন এক যাত্রী, যিনি দাবি করেন শুরু থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইঞ্জিনে সমস্যা আছে। দীর্ঘদিন ট্রাক চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে ইঞ্জিনের শব্দ শুনেই তার সন্দেহ হয়েছিল বলে জানান তিনি, এমনকি বলেন এমন শব্দ শুনলে তিনি কখনো ট্রাক নিয়ে রাস্তায় নামতেন না। পাইলট আগে থেকে বিষয়টি বুঝতে না পারায় তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে সমালোচনা শুরু করেন। বিমান ক্রুরা পরিস্থিতি সামলে যাত্রীদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেন এবং জানান, ঢাকায় নামার পর দ্রুতই অন্য একটি বিমানে সিলেট পাঠানো হবে যাত্রীদের। তবে ওই ট্রাকচালক যাত্রী ঘোষণা দেন, কোনো অবস্থাতেই তিনি আর সেই বিমানে উঠবেন না।
এই উত্তেজনার মধ্যেও হাস্যরসের ছোঁয়া দেন খোকনের পাশের আসনে বসা দুই ভাই সুলতান ও হোসেন। তার নীরবতা দেখে মায়া হওয়ায় একজন তাকে মিষ্টান্ন এগিয়ে দিয়ে বলেন, সকাল থেকে তিনি কিছু খাননি। খোকন লেখেন, সাধারণত মিষ্টান্ন এড়িয়ে চললেও জীবনের কিছু মুহূর্তে খাদ্যাভ্যাসের নিয়ম শিথিল করাই ভালো, তাই সেই মুহূর্তে মিষ্টি খেয়ে নেন তিনি। এরপর সেই ট্রাকচালক যাত্রী তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কিছু টের পেয়েছেন কি না, তবে খোকন কোনো জবাব না দিয়ে চুপ থাকেন, যা দেখে বিমান ক্রুরাও তার প্রতি কৃতজ্ঞতাসূচক হাসি দেন।
শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই ঢাকায় অবতরণ করে ফ্লাইটটি, এরপর দ্রুত যাত্রীদের অন্য একটি বিমানে তোলা হয়। নতুন বিমানে উঠেই আবার নিজের বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে হাজির হন সেই ট্রাকচালক যাত্রী, এবারের ইঞ্জিনের শব্দ আগেরটির চেয়ে ভিন্ন বলে দাবি করেন তিনি। খোকন নিজের মেটা গ্লাসে রেকর্ড করা শব্দ চালিয়ে শুনিয়ে দেখেন, শব্দ সত্যিই ভিন্ন ছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লেখেন, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পাইলটের পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ ট্রাকচালকের উপস্থিতিও কখনো কখনো বেশ উপকারী হতে পারে।
দ্বিতীয় ফ্লাইটে আর কোনো জটিলতা ছাড়াই নিরাপদে সিলেটে অবতরণ করেন তারা। ভ্রমণ শেষে ব্যবসায়িক কাজে সিলেটে আসা সহযাত্রী সুলতান ও হোসেন তাকে আন্তরিকভাবে তাদের রেস্তোরাঁয় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান বলেও উল্লেখ করেন খোকন তার পোস্টে।





